নবীন-প্রবীণদের নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠনের পরিকল্পনা বিএনপির
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। সরকার গঠনের লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই দলীয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে আলোচনা ও প্রস্তুতি।
এবারের মন্ত্রিসভায় দলের অভিজ্ঞ ও প্রবীণ নেতাদের পাশাপাশি গুরুত্ব পাচ্ছেন নতুন রাজনীতিবিদরাও। এছাড়া বর্তমান উপদেষ্টা পরিষদের চারজনের বিষয়ে ভাবছে বিএনপি।
দলীয় সূত্র বলছে, নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, প্রশাসনে গতি আনা, নীতি নির্ধারণে নতুন ভাবনা এবং নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি করতেই তরুণদের অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে জোর দেওয়া হচ্ছে। ফলে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মন্ত্রিসভা গঠনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, মন্ত্রিপরিষদ গঠন নিয়ে আলোচনা চলছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিষয়টি দেখভাল করছেন। দুয়েকদিনের মধ্যে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। কারা কারা থাকছেন তা আগাম বলা কঠিন।
এর আগে, গতকাল শুক্রবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও কক্সবাজার-১ আসন থেকে নির্বাচিত এমপি সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন, বিএনপির কেমন মন্ত্রিসভা হতে যাচ্ছে, তা দেখার জন্য দেশবাসীকে আর অল্প কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের চার উপদেষ্টা
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের চার সদস্যকে মন্ত্রিপরিষদে রাখা নিয়ে ভাবছে বিএনপি। দলীয় সূত্রে জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এবং পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। দলটির পর্যবেক্ষণ হচ্ছে এই চার উপদেষ্টা যোগ্যতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।
গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী অস্থির সময়ে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ রেখেছে। ফলে এসব উপদেষ্টাকে দেশের জন্য কাজে লাগাতে ইতিবাচক বিএনপি। আপত্তি না থাকলে নতুন মন্ত্রী পরিষদে টেকনোক্র্যাট হিসেবে জায়গা পেতে পারেন তারা। তবে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্যের আপত্তি রয়েছে।
আলোচনায় যারা
বিএনপির সাবেক কয়েকজন মন্ত্রীকে এবারের মন্ত্রী পরিষদেও রাখার কথা ভাবছে বিএনপি। এ বিষয়ে দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপির বিগত সরকারের সময়ে যেসব মন্ত্রণালয় বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল, যাদের বিষয়ে বিতর্ক নেই, ক্লিন ইমেজ রয়েছে তাদের নতুন সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বে রাখা হবে।
এদের মধ্যে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, মির্জা আব্বাসকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে দেখা যেতে পারে। সালাহউদ্দিন আহমেদও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন। এছাড়া আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে পররাষ্ট্র অথবা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে দেখা যেতে পারে।
আ ন ম এহসানুল হক মিলনকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিষয়ে ভাবা হচ্ছে। এছাড়া স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু মন্ত্রী পরিষদে থাকছেন। স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য নজরুল ইসলাম খানকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
মন্ত্রিপরিষদে থাকছেন নতুন মুখ
নতুন মন্ত্রিপরিষদে যুক্ত হচ্ছে একাধিক নতুন মুখ। দলের নতুন নেতৃত্ব তৈরি করতে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের যুক্ত করা হবে। সম্ভাবনাময়ী এমন কয়েকজনকে মন্ত্রী পরিষদে রাখা হচ্ছে। এদের মধ্যে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় (টেকনোক্র্যাট), চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ইসমাইল জবিউল্লাহকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় (টেকনোক্র্যাট), যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (টেকনোক্র্যাট) হিসেবে বিবেচনায় আছে। এছাড়া স্থায়ী কমিটর সদস্য ড. এজেডএম জাহিদ হোসেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার আলোচনায় আছেন। অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় পেতে পারেন।
আলোচনায় যুগপৎ আন্দোলনের শরিকরা
কয়েক বছর আগে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলো নিয়ে জাতীয় সরকারের ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি। ফলে নতুন মন্ত্রী পরিষদে থাকছে যুগপৎ আন্দোলনের একাধিক নেতা। দলটির নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে যারা একসঙ্গে ছিল, সরকার গঠন প্রক্রিয়াতেও তাদের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা হবে।
অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল কাঠামোর মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনর্গঠন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণই হবে এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। এদের মধ্যে রয়েছে—সম্প্রতি বিএনপিতে যোগ দেওয়া ড. রেজা কিবরিয়াকে অর্থমন্ত্রী মন্ত্রণালয়, এনডিএম ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেওয়া ববি হাজ্জাজ, বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর এবং টেকনোক্র্যাট কোটায় ১২ দলীয় জোট প্রধান ও জাতীয় পার্টির (জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার আলোচনায় রয়েছে।
সংবিধান অনুযায়ী, নতুন সরকার গঠনের শুরুটা হবে নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহণের মাধ্যমে। সংসদ সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়োগ নেবেন রাষ্ট্রপতি। প্রধানমন্ত্রী শপথ গ্রহণের মধ্যে দিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। এরপর নতুন প্রধানমন্ত্রী তার নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা গঠন শুরু করবেন। নতুন মন্ত্রিসভা কত সদস্যবিশিষ্ট হবে সেটা নির্ধারণ করবে নির্বাচনে বিজয়ী দল।

























