ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফর ঘিরে বিশ্ব কূটনীতিতে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক গ্রেট হল অফ টি পিপল-এ চীনের প্রেসিডেন্ট এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট এর মধ্যে আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের শুরু থেকেই দুই নেতা ইতিবাচক বার্তা দিলেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বাণিজ্য, তাইওয়ান এবং ইরান সংকট।
চীনে পৌঁছানোর পর ট্রাম্পকে জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। বিমানবন্দরে লাল গালিচা, পতাকা হাতে শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা; সব মিলিয়ে ছিল রাষ্ট্রীয় আয়োজন। তবে কূটনৈতিক মহলে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে একটি বিষয় প্রেসিডেন্ট শি নিজে বিমানবন্দরে ট্রাম্পকে অভ্যর্থনা জানাতে যাননি। বিশ্লেষকদের মতে, এটি চীনের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক প্রটোকলের অংশ হলেও এর মাধ্যমে বেইজিং সমমর্যাদার বার্তাও দিতে চেয়েছে।
চীন সফরের আগে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দুই দেশ এবং এই সফরের মূল লক্ষ্য হবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করা। তিনি চীনের বাজার মার্কিন প্রযুক্তি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য আরও উন্মুক্ত করার আহ্বান জানান।
এই সফরে ট্রাম্পের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীরাও অংশ নিয়েছেন। তালিকায় রয়েছেন ইলন মাস্ক, টিম কুক, জেনসেন হুয়াং, ল্যারি ফিঙ্ক এবং ডেভিড সলোমন-সহ প্রযুক্তি, ব্যাংকিং ও শিল্পখাতের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। ধারণা করা হচ্ছে, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন সমঝোতা তৈরির লক্ষ্যেই এই উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলকে সঙ্গে নেওয়া হয়েছে।
বৈঠকের শুরুতে ট্রাম্প শি জিনপিংকে “মহান নেতা” হিসেবে উল্লেখ করেন এবং দুই দেশের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। জবাবে শি বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের উচিত প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং অংশীদার হিসেবে কাজ করা। তিনি এই বৈঠককে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য একটি “ঐতিহাসিক মাইলফলক” বলেও উল্লেখ করেন।
অর্থনৈতিক আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। চীন ইতোমধ্যে কয়েকটি মার্কিন গরুর মাংস রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন করেছে। পাশাপাশি বোয়িং বিমান ক্রয়, কৃষিপণ্য আমদানি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই তদারকিতে যৌথ কাঠামো গঠনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে উষ্ণ পরিবেশের মাঝেও তাইওয়ান ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বেইজিং। শি জিনপিং ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছেন, তাইওয়ান প্রশ্ন ভুলভাবে পরিচালিত হলে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সংঘাত তৈরি হতে পারে। যদিও ট্রাম্প প্রকাশ্যে কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি, তবে আলোচনার দরজা খোলা রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ও ইরান সংকট। সাম্প্রতিক উত্তেজনায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। সূত্রগুলো বলছে, ট্রাম্প চীনের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন যাতে বেইজিং তাদের প্রভাব ব্যবহার করে ইরানকে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে রাজি করায়। একই সঙ্গে ইরানের কাছে উন্নত সামরিক প্রযুক্তি সরবরাহ নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে কূটনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে।
তবে চীন প্রকাশ্যে জানিয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা চায় এবং যুদ্ধের দ্রুত সমাপ্তির পক্ষে। একইসঙ্গে বেইজিং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নীতিরও সমালোচনা করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, চীন একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইছে, অন্যদিকে ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে তাদের জ্বালানি নির্ভর সম্পর্কও অক্ষুণ্ণ রাখতে চায়।
বিশ্ব রাজনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক কোন পথে এগোবে, তা নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

























