ঢাকা   বৃহস্পতিবার ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩, ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন

ট্রাম্পকে প্রত্যাখ্যান মার্কিন ভোটারদের

আন্তর্জাতিক

বিডিটোন ডেস্ক

প্রকাশিত: ০০:১২, ৫ নভেম্বর ২০২৬

আপডেট: ০০:১২, ৫ নভেম্বর ২০২৬

ট্রাম্পকে প্রত্যাখ্যান মার্কিন ভোটারদের

ট্রাম্পকে প্রত্যাখ্যান মার্কিন ভোটারদের

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত দুই বছরে দেশটির গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করার নানা চেষ্টা করেছেন। কিন্তু গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটাররা সে প্রচেষ্টার জবাব দিয়েছেন ব্যালটের মাধ্যমে।

নির্বাচনি সীমানা পুনর্নির্ধারণে পক্ষপাত, ভোট জালিয়াতির ভিত্তিহীন অভিযোগ এবং ডাকযোগে ভোটদান বাধাগ্রস্ত করার উদ্যোগ সত্ত্বেও কয়েক কোটি ভোটার কেন্দ্রে উপস্থিত হন। ট্রাম্পকে সমর্থন দেওয়া রিপাবলিকান পার্টিকে প্রত্যাখ্যান করে ডেমোক্র্যাটদের সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেন। একই সঙ্গে প্রতিনিধি পরিষদেও দলটি সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে যায়।

গভীর রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যেও ফলাফলটি রিপাবলিকানদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে। কানসাস, কেনটাকি, আইওয়া, ওহাইও, দক্ষিণ ক্যারোলিনা ও টেক্সাসের মতো ঐতিহ্যগত রিপাবলিকান ঘাঁটিতেও দলটি পরাজিত হয়েছে। বহু স্বতন্ত্র ভোটার এবং রিপাবলিকান সমর্থক ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদকে ব্যর্থ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন।

এ নির্বাচনের ফল ট্রাম্পের ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের প্রবণতার ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এতে ডেমোক্র্যাটরা তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের সুযোগ পাবে এবং তার নীতির বিকল্প আইন প্রণয়নের পথও উন্মুক্ত হবে। জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিবর্তন আরো স্পষ্ট হবে।

তবে দেশটির সামনে দীর্ঘমেয়াদি বহু সংকট এখনো রয়ে গেছে, যার কার্যকর সমাধান কোনো দলই স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারেনি। আগামী দুই বছর ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বে থাকবেন। এ সময় কংগ্রেস ও বিচার বিভাগকে সাংবিধানিক শৃঙ্খলা দুর্বল করার যেকোনো নতুন প্রচেষ্টা মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে হবে।

তারপরও এ দিনটি মার্কিন গণতন্ত্রের জন্য গর্বের। অনেক দেশে স্বৈরতান্ত্রিক নেতারা আইনসভা নির্বাচনকে নিজেদের ক্ষমতা আরো সুসংহত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। কিন্তু ২০২৬ সালে মার্কিন ভোটাররা ট্রাম্পকে সেই সুযোগ দেননি। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিজেদের স্থিতিশীলতা প্রমাণ করেছে।

এক্ষেত্রে ভোটারদের পাশাপাশি নির্বাচনকর্মী, আইনজীবী ও বিচারকরা বিশেষভাবে প্রশংসার দাবিদার।

ট্রাম্পের অব্যাহত চাপ ও অভিযোগের মুখেও নির্বাচনকর্মীরা নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি প্রমাণ ছাড়াই দাবি করে আসছেন, ব্যাপক ভোট জালিয়াতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন নির্ধারিত হয়। কিন্তু বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনকর্মীরা ভোটারদের ভোট দিতে সহায়তা করেছেন এবং নিরপেক্ষভাবে ভোট গণনা সম্পন্ন করেছেন।

অনেক অঙ্গরাজ্যে নির্বাচন কর্মকর্তারা ট্রাম্প প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ঠেকাতে সরাসরি পদক্ষেপ নেন। গত বছর বিচার বিভাগ অঙ্গরাজ্যগুলোকে ভোটারদের জন্মতারিখ, ড্রাইভিং লাইসেন্সের তথ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা নম্বরের আংশিক তথ্য দিতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু কয়েকজন রিপাবলিকান কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তা প্রত্যাখ্যান করেন।

এক্ষেত্রে উটাহর রিপাবলিকান লেফটেন্যান্ট গভর্নর ডেইড্রে হেন্ডারসন, মিশিগানের ডেমোক্রেটিক সেক্রেটারি অব স্টেট জসলিন বেনসন এবং ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার রিপাবলিকান সেক্রেটারি অব স্টেট ক্রিস ওয়ার্নার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন । প্রশাসনের মামলার মুখোমুখি হলেও তারা আদালতে জয়ী হন।

তাদের এ অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের বিকেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে। সংবিধানের নির্বাচন–সংক্রান্ত ধারা অনুযায়ী প্রতিটি অঙ্গরাজ্য নিজস্বভাবে নির্বাচন পরিচালনা করে। ফলে প্রেসিডেন্টের পক্ষে তাদের সিদ্ধান্ত বাতিল করা সম্ভব নয়। এ ফেডারেল কাঠামো ট্রাম্পের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করেছে।

গণতন্ত্র রক্ষায় দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন আইনজীবীরা। ভোটার নিবন্ধন জটিল করা, ডাকযোগে আসা কিছু ভোট বাতিলের উদ্যোগ এবং ডাক বিভাগের মাধ্যমে কারা ডাকযোগে ভোটপত্র পাবেন তা নির্ধারণের মতো নির্বাহী আদেশ জারির পরপরই তারা আদালতের দ্বারস্থ হন।

এ উদ্যোগে অংশ নেয় ব্রেনান সেন্টার, আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন, লিগ অব উইমেন ভোটার্স, কমন কজ এবং ডেমোক্রেটিক অঙ্গরাজ্যগুলোর অ্যাটর্নি জেনারেলরা। গত দুই বছরে অনেক প্রভাবশালী আইন প্রতিষ্ঠান ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত আইনি পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে অনীহা দেখালেও অলাভজনক সংস্থাগুলো সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।

তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ফেডারেল বিচারকরা। ট্রাম্প ও তার সমর্থকদের চাপ সত্ত্বেও তারা আইন ও সংবিধান অনুসরণে অটল থাকেন। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের বিচারকরা, এমনকি ট্রাম্পের নিয়োগ দেওয়া বিচারকরাও নির্বাচন-সংক্রান্ত নির্বাহী আদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ স্থগিত করেন। জেলা আদালতের টানা ২৭টি রায়ে বিচার বিভাগকে অঙ্গরাজ্যগুলোর ভোটার তালিকা হস্তান্তরের দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়।

সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা ছিল মিশ্র। আদালত এমন কিছু রায় দিয়েছিল, যা চরম দলীয় স্বার্থে নির্বাচনি সীমানা পুনর্নির্ধারণ এবং জাতীয় ভোটার ডেটাবেজ তৈরির প্রচেষ্টাকে সম্ভব করে তোলে। তবে একই সঙ্গে আদালত ভোটাধিকার সুরক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দেয়। সেপ্টেম্বরে নিম্ন আদালতের একটি রায় বহাল রেখে ডাক বিভাগের এমন পদক্ষেপে নিষেধাজ্ঞা দেয়, যা ডাকযোগে ভোটদান সীমিত করতে পারত।

এ রায় দেখিয়েছে, নির্বাচন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টেরও কিছু স্পষ্ট সীমারেখা রয়েছে। ২০২০ সালের নির্বাচন শেষে ট্রাম্পের ভোট জালিয়াতির অভিযোগসংবলিত মামলাগুলো শুনানির জন্য গ্রহণ করেননি বিচারকরা। আগামী সপ্তাহগুলোতে এ ধরনের নতুন দাবিও আদালতের সামনে আসতে পারে।

তবে সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো যেন এ বছরের অর্জনকে আড়াল না করে। নির্বাচনকর্মী, আইনজীবী ও বিচারকেরা ভোটাধিকার রক্ষাকারী নিয়মগুলোকে সুরক্ষা দিয়েছেন। আর কয়েক কোটি মার্কিন নাগরিক ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাদের সবচেয়ে মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন। তারা দেখিয়েছেন, দেশের নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত জনগণের হাতেই থাকে।

এখন প্রয়োজন, প্রতিটি নির্বাচনের ফল আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হওয়া এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দায়িত্ব গ্রহণ করা পর্যন্ত সেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি সতর্ক নজর রাখা।

সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস