ঢাকা   রোববার ১৫ মার্চ ২০২৬, ১ চৈত্র ১৪৩২, ২৬ রমজান ১৪৪৭

‘সিগনালের যুদ্ধ’: মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে রাশিয়া-চীন-ইরান সহযোগিতা নিয়ে নতুন আলোচনা

আন্তর্জাতিক

বিডিটোন ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯:০১, ১৫ মার্চ ২০২৬

আপডেট: ০৯:০৩, ১৫ মার্চ ২০২৬

‘সিগনালের যুদ্ধ’: মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে রাশিয়া-চীন-ইরান সহযোগিতা নিয়ে নতুন আলোচনা

ইরানকে পরোক্ষভাবে গোয়েন্দা বা প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে আধুনিক যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—“সিগনালের যুদ্ধ” বা তথ্যভিত্তিক যুদ্ধ নিয়ে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, বর্তমান সংঘাত কেবল মিসাইল বা বোমার যুদ্ধ নয়; বরং স্যাটেলাইট, ড্রোন, রাডার ও গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে পরিচালিত এক জটিল প্রযুক্তিনির্ভর লড়াই।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে “The War of Signals” শিরোনামে উল্লেখ করেছে, ইরান তার সামরিক অভিযানে তথ্যপ্রযুক্তি, স্যাটেলাইট নজরদারি এবং ইলেক্ট্রনিক সিগন্যাল ব্যবস্থার ওপর ক্রমেই বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক যুদ্ধে শত্রুপক্ষের সঠিক অবস্থান নির্ণয় করতে পারা বিজয়ের অন্যতম প্রধান শর্ত।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সাবেক কর্মকর্তা ব্রুস রিডেল বলেন, “আধুনিক যুদ্ধে গুলির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য বা কোঅর্ডিনেট। শত্রু কোথায় আছে—যে পক্ষ এটি সঠিকভাবে জানতে পারে, শেষ পর্যন্ত সেই পক্ষই কৌশলগত সুবিধা পায়।”

সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার ঘটনায় মার্কিন কর্মকর্তারা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে কুয়েত ও ইরাক অঞ্চলে সংঘটিত কিছু হামলায় লক্ষ্যবস্তু অত্যন্ত নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে বলে পেন্টাগনের কর্মকর্তারা মনে করছেন। তাদের মতে, এসব হামলা কেবল অনুমানভিত্তিক ছিল না; বরং নির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই পরিচালিত হয়েছে।

ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া মন্তব্যে কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, হামলার লক্ষ্যবস্তুগুলো মূলত ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত অপারেশনাল স্থাপনা ছিল। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—এই ধরনের সংবেদনশীল তথ্য কোথা থেকে পাওয়া যেতে পারে।

কিছু পশ্চিমা বিশ্লেষকের ধারণা, ইরানকে পরোক্ষভাবে গোয়েন্দা বা প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে পারে রাশিয়া। যদিও মস্কো এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এক পর্যায়ে মার্কিন নেতৃত্বের পক্ষ থেকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগও করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে ইরাকের ইরবিল অঞ্চলের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার ঘটনায় ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি মন্তব্য করেন, ঘটনাটির পেছনে “পুতিনের hidden hand থাকতে পারে।” ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে বলা হয়, রাশিয়া সরাসরি সংঘাতে অংশ না নিলেও ইরানকে কৌশলগত সহায়তা দিতে পারে।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানি ড্রোনগুলো অনেক সময় খুব নিচু উচ্চতায় উড়ে রাডার এড়িয়ে যায়, যা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের সম্ভাবনা বাড়ায়। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ব্যবহৃত Shahed কামিকাজে ড্রোনেও একই ধরনের কৌশল দেখা গেছে।

অন্যদিকে প্রযুক্তিগত সহায়তার ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের BeiDou নেভিগেশন সিস্টেম ব্যবহার করলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের লক্ষ্য নির্ধারণ আরও নির্ভুল হতে পারে। একই সঙ্গে রাশিয়ার উন্নত নজরদারি স্যাটেলাইট—যেমন Kanopus-V—উচ্চ রেজুলেশনের ছবি ও রাডার ডেটা সংগ্রহে সক্ষম।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের হার্ডওয়্যার প্রযুক্তি এবং রাশিয়ার গোয়েন্দা সক্ষমতা—এই দুইয়ের সমন্বয় ইরানের সামরিক কার্যক্রমে কৌশলগত সুবিধা এনে দিতে পারে।

এদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত রাশিয়ার জন্য কিছু ক্ষেত্রে কৌশলগত সুবিধা তৈরি করেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, যা রাশিয়ার অর্থনীতিকে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে আন্তর্জাতিক মনোযোগ কিছুটা সরে যাওয়াও মস্কোর জন্য স্বস্তির কারণ হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

সামগ্রিকভাবে বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক যুদ্ধের নতুন বাস্তবতায় “তথ্য, স্যাটেলাইট ও সিগন্যাল” ক্রমেই প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠছে। ফলে ভবিষ্যতের সংঘাতে সামরিক শক্তির পাশাপাশি গোয়েন্দা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।

সম্পর্কিত বিষয়: