ঢাকা   মঙ্গলবার ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ২৩ চৈত্র ১৪৩২, ১৯ শাওয়াল ১৪৪৭

কিম পরিবারের উত্তর কোরিয়া দখলের ইতিহাস

কিম পরিবারের উত্তর কোরিয়া দখলের ইতিহাস

১৯৭২ সালে উত্তর কোরিয়ার সংবিধানে কিম ইল সুং কে আদর্শ হিসাবে ঘোষণা করা হয়

কোরীয় যুদ্ধের পর ‘জুচে’ মতাদর্শে ক্ষমতা পোক্ত করেন কিম ইল সুং, গড়ে ওঠে উত্তর কোরিয়ার ব্যক্তিপূজাভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। কোরীয় যুদ্ধ ১৯৫৩ সালে থেমে যাওয়ার পর উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা নেতা কিম ইল সুং দ্রুত নিজের ক্ষমতা আরও দৃঢ় করার পথে এগিয়ে যান। ইতিহাসবিদদের মতে, তিনি খুব ভালোভাবেই বুঝেছিলেন যে কেবল পুলিশ, সেনাবাহিনী বা দমন-পীড়নের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। সেই বাস্তবতা থেকেই তিনি ধীরে ধীরে এমন এক রাষ্ট্রীয় মতাদর্শ দাঁড় করান, যেখানে রাজনীতি, জাতীয়তাবাদ এবং নেতার ব্যক্তিপূজা একসূত্রে গাঁথা হয়ে যায়। 

এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘জুচে’। ১৯৫৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর কিম ইল সুং প্রথমবারের মতো এই ধারণাকে প্রকাশ্যে সামনে আনেন। আনুষ্ঠানিকভাবে জুচে আত্মনির্ভরতার কথা বললেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি এমন এক মতাদর্শে রূপ নেয় যেখানে বলা হয়—উত্তর কোরিয়ার জনগণ নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই গড়বে, তবে সেই পথ নির্ধারণ করবেন একমাত্র নেতা ও তার বিপ্লবী নেতৃত্ব। 

পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে উত্তর কোরিয়ার সংবিধানে জুচেকে রাষ্ট্র পরিচালনার আনুষ্ঠানিক ভিত্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গবেষকদের মতে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে কিম ইল সুং শুধু একজন রাজনৈতিক শাসকই থাকেননি; তাকে রাষ্ট্র, বিপ্লব ও জাতির অবিচ্ছেদ্য প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর ফলে উত্তর কোরিয়ায় ব্যক্তিপূজাকেন্দ্রিক শাসন আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। 

বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ায় জুচে কেবল একটি রাজনৈতিক তত্ত্ব নয়; এটি শিক্ষা, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। শৈশব থেকেই নাগরিকদের শেখানো হয় যে কিম পরিবারই দেশের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের একমাত্র গ্যারান্টি। এই প্রোপাগান্ডা কাঠামোই উত্তর কোরিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী শাসনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছে। 

বর্তমানে উত্তর কোরিয়ার জনসংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখের কাছাকাছি। অর্থনৈতিক সংকট, খাদ্যাভাব এবং বৈশ্বিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্নতার নানা অভিযোগ বহু বছর ধরেই রয়েছে। তবু দেশটিতে বড় আকারের জনবিদ্রোহ দেখা যায় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে কেবল নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোরতা নয়, বরং দীর্ঘদিনের মতাদর্শগত নিয়ন্ত্রণ, তথ্যনিয়ন্ত্রণ এবং নেতাকে প্রায় অতিমানবীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠার রাজনীতি বড় ভূমিকা রাখে। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর কোরিয়ার শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সেখানে রাষ্ট্র পরিচালনায় বন্দুকের পাশাপাশি বিশ্বাসের কাঠামোকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ শাসন টিকিয়ে রাখতে শুধু শক্তি নয়, মানুষের মানসিক জগৎকেও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হয়েছে। আর সেই কারণেই জুচে মতাদর্শকে অনেক গবেষক উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতার প্রকৃত “মেরুদণ্ড” হিসেবে বর্ণনা করেন। 

সম্পর্কিত বিষয়: