সোহেল রানা ছিলেন পুরো সময় তবে তুলে নেওয়া হয় সামিত কে
র্যাঙ্কিংয়ের ব্যবধান এবার মাঠেও স্পষ্ট। র্যাঙ্কিংয়ে মালয়েশিয়া ১৩৬, বাংলাদেশ ১৮১। জাকার্তার গেলোরা বুং কার্নো স্টেডিয়ামে এর উদ্বোধনী ম্যাচে সেই ব্যবধান শুধু স্কোরলাইনেই নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক পারফরম্যান্সেও ধরা পড়েছে। ৩–০ গোলের হার দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করা বাংলাদেশ ম্যাচজুড়ে লড়াইয়ের চেষ্টা করলেও রক্ষণভাগের দুর্বলতা, মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি এবং আক্রমণে ধারাবাহিকতার অভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
ম্যাচের শুরু থেকেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল ডিফেন্সিভ সংগঠন। মালয়েশিয়া আক্রমণে উঠলেই বাংলাদেশের রক্ষণভাগকে বেশ কয়েকবার অগোছালো দেখিয়েছে। ডিফেন্ডারদের মধ্যে দূরত্ব, প্রতিপক্ষের দৌড় অনুসরণ এবং দ্বিতীয় বলের লড়াই—সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশকে পিছিয়ে থাকতে দেখা গেছে। ফলে মালয়েশিয়া বারবার বাংলাদেশের বক্সের আশপাশে জায়গা তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রতিপক্ষকে এমন জায়গা দিলে তার মূল্য দিতে হয় এই ম্যাচেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
শুধু রক্ষণ নয়, রক্ষণ থেকে মাঝমাঠ এবং মাঝমাঠ থেকে আক্রমণে সংযোগও ছিল দুর্বল। বাংলাদেশের হাতে বল এলেও দ্রুত আক্রমণে যাওয়ার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত গতি ছিল না। বিপরীতে মালয়েশিয়া বল হারানোর পর দ্রুত চাপ তৈরি করেছে এবং বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কমিয়ে দিয়েছে। ফলে অনেক আক্রমণ শুরু হওয়ার আগেই থেমে গেছে।
তবে বাংলাদেশের জন্য ম্যাচের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক ছিল নতুন তিন মুখের পারফরম্যান্স। জিদান ইউসুফ, ফারহান আলী ওয়াহিদ ও শূকি ইতুফুসা; তিনজনই অভিষেকের ম্যাচে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন। ম্যাচের আগে তিনজনকে ঘিরে যে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, পারফরম্যান্স দিয়ে তার যথেষ্ট প্রতিদান দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তারা। জিদান রক্ষণে দায়িত্বশীলতার পাশাপাশি প্রতিপক্ষের আক্রমণ সামলানোর ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস দেখিয়েছেন। ফারহান আক্রমণভাগে গতি, বল নিয়ন্ত্রণ ও ইতিবাচক মুভমেন্ট দিয়ে নজর কেড়েছেন। শূকিও বল পায়ে সক্রিয় ছিলেন এবং আক্রমণ তৈরির ক্ষেত্রে কয়েকটি ভালো মুহূর্ত তৈরি করেছেন। তিনজনের পারফরম্যান্সই অন্তত একটি জায়গায় আশার আলো দেখিয়েছে জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের কার্যকরভাবে ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে। তিনজনকেই কোচ থমাস ডুলির চূড়ান্ত ২৩ সদস্যের দলে রাখা হয়েছিল।
অভিষিক্ত জিদান ইউসুফ, ফারহান আলী ওয়াহিদ এবং শুকী ইতুফসা
তবে নতুনদের ইতিবাচক পারফরম্যান্সের বিপরীতে পুরোনো সমস্যাগুলোই ম্যাচের ফল নির্ধারণ করেছে। বিশেষ করে সমিতকে বারবার নিচে তুলে আনার বিষয়টি বাংলাদেশের আক্রমণাত্মক কাঠামোকে কতটা প্রভাবিত করেছে, সেটি আলোচনার দাবি রাখে। আক্রমণভাগে যখন আরও বেশি উপস্থিতি প্রয়োজন ছিল, তখন তাকে নিচে নেমে এসে বল সংগ্রহ করতে হয়েছে। এর ফলে শেষ তৃতীয়াংশে বাংলাদেশের খেলোয়াড় সংখ্যা ও আক্রমণের ধার কমেছে ম্যাচের গতিপ্রকৃতিতে এমন চিত্রই দেখা গেছে।
বরাবরের মতই সোহেল রানাকে ঘিরে সেই পুরনো বিতর্ক। মাঝমাঠে তার কাছ থেকে প্রত্যাশিত প্রভাব পাওয়া যায়নি। বলের নিয়ন্ত্রণ, পাসিং এবং আক্রমণ তৈরিতে তার কার্যকারিতা সীমিত ছিল। ম্যাচের একাধিক পর্যায়ে তার সিদ্ধান্ত ও বল ব্যবহারে বাংলাদেশের আক্রমণের গতি কমেছে। এমন পরিস্থিতির পরও কোচ তাকে মাঠে রেখেছেন। ফলে বদলি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বিশেষ করে যখন বাংলাদেশ মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছিল এবং ম্যাচের গতি বদলানোর প্রয়োজন ছিল।
সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিতে পারে জামাল ভূঁইয়াকে মাঠে না নামানোর সিদ্ধান্ত। ম্যাচের আগে বাংলাদেশ অধিনায়ক ও অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার জামাল ভূঁইয়াকে মালয়েশিয়ার বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। ম্যাচ প্রিভিউতেও মালয়েশিয়ার ব্র্যাড ট্যাপের সঙ্গে তার সম্ভাব্য মাঝমাঠের লড়াইকে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ-আপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে ব্যবহার করা হয়নি। বাংলাদেশ যখন মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারছিল না, তখন জামালের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ কেন নেওয়া হলো না এই প্রশ্নের উত্তর কোচের ম্যাচ-পরবর্তী ব্যাখ্যাতেই পরিষ্কার হবে।
অবশ্য মালয়েশিয়ার শক্তির কথাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ ১৮১তম স্থানে থাকা দল, বিপরীতে মালয়েশিয়া ১৩৬তম। মালয়েশিয়ার স্কোয়াডেও বিভিন্ন দেশের ফুটবল সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা একাধিক খেলোয়াড় রয়েছেন। ফলে প্রতিপক্ষের মান ও অভিজ্ঞতার পার্থক্য ছিল বাস্তব।
তবু ৩–০ ব্যবধানের হার বাংলাদেশের জন্য কেবল র্যাঙ্কিংয়ের পার্থক্যের গল্প নয়। বরং ম্যাচটি সামনে এনেছে দলের পুরোনো কিছু দুর্বলতা রক্ষণে সমন্বয়ের অভাব, মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ হারানো, আক্রমণে ধারাবাহিকতার ঘাটতি এবং ম্যাচ পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত পরিবর্তন আনতে না পারা।
থমাস ডুলির জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে এই ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়া। কারণ সামনে অপেক্ষা করছে আরও দুটি কঠিন ম্যাচ ২৮ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুর এবং ১ অক্টোবর স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে।
মালয়েশিয়ার বিপক্ষে নতুন তিন মুখ জিদান, ফারহান ও শূকি আশার জায়গা তৈরি করেছেন। কিন্তু তাদের ভালো পারফরম্যান্সকে ফলাফলে রূপ দিতে হলে দলকে আরও সংগঠিত হতে হবে। বিশেষ করে রক্ষণকে শক্ত করা, মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনা এবং মাঠের পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিক সময়ে সঠিক পরিবর্তন পরের ম্যাচগুলোতে বাংলাদেশের জন্য এই তিনটি বিষয়ই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

























