জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে দলের নেতারা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর গুলশানে লেকশোর হোটেলে তাদের ৩৬ দফার নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে। ইশতেহারের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’, যা দেশের যুব ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের ওপর কেন্দ্রীভূত। এ সময় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দলের যুগ্ম আহ্বায়ক, মুখ্য সমন্বয়ক ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, শিক্ষাবিদ ও কূটনীতিক।
অনুষ্ঠানে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমরা দীর্ঘ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে অর্জিত নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও সংস্কারের দাবি বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের লক্ষ্য শুধু নির্বাচনী জয় নয়, বরং দেশের মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনা।” নাহিদ ইসলাম আরও জানান, এনসিপি নির্বাচনী জোটে থাকলেও নতুন বন্দোবস্ত ও সংস্কারের দাবিতে অটল, এবং এই ইশতেহারের মাধ্যমে দেশের যুব ও সাধারণ জনগণের জন্য দূর্নীতি, চাঁদাবাজি ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ইশতেহারটি ১২টি ভাগে বিভক্ত, যেখানে ৩৬টি প্রধান পদক্ষেপ নির্বাচকের দৃষ্টি আকর্ষণ ও জনগণের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলবে এমন বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
ইশতেহারের প্রধান প্রতিশ্রুতি ও লক্ষ্যগুলোঃ
১। ভোটের বয়স হবে ১৬ বছর, তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কার্যকর করা হবে।
২। কর্মসংস্থান সৃষ্টিঃ আগামী ৫ বছরে দেশে এক কোটি সম্মানজনক চাকরি।
৩। চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক ব্যয় বন্ধঃ ব্যবসা ও বিনিয়োগে রাজনৈতিক বাধা শূন্যে নামানো হবে।
৪। শিক্ষা সংস্কারঃ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যৌক্তিক সমন্বয়, এমপিওভুক্তি ও বেতন কাঠামো সংস্কার।
৫। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাঃ জরুরি চিকিৎসা, প্রি-হসপিটাল সেবা, ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড, ও বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা জোন।
৬। নারীর ক্ষমতায়নঃ সংরক্ষিত আসন, মাতৃত্বকালীন ও পিতৃত্বকালীন ছুটি, নিরাপদ চলাচল ও কর্মস্থল।
৭। অর্থনীতি ও শিল্পঃ কর সংস্কার, বিনিয়োগ উৎসাহ, আর্থিক শৃঙ্খলা, রপ্তানি বৈচিত্র্য এবং স্থানীয়-বিদেশি ব্যবসার জন্য সুবিধা।
৮। পরিবেশ ও প্রযুক্তিঃ দূষণ নিয়ন্ত্রণ, নবায়নযোগ্য শক্তি উৎস, ইলেকট্রিক ভেহিকেল, শিল্পে ইটিপি বাধ্যতামূলক।
৯। কৃষি ও খাদ্যঃ সরাসরি পণ্য ক্রয়, বীজ ও সার বিতরণ, খাদ্য সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত।
১০। সশস্ত্র বাহিনী ও নিরাপত্তাঃ রিজার্ভ ফোর্স দ্বিগুণ করা, ড্রোন ব্রিগেড ও মিড-রেঞ্জ স্যুরফেস-টু-এয়ার মিসাইল ব্যাটারি তৈরি।
১১। ন্যায্য বিচার ও মানবাধিকারঃ গণহত্যা, বিডিআর হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের নিশ্চয়তা; মানবাধিকার কমিশন ও ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠন।
১২। প্রবাসী ও মেধাবী প্রেরণঃ রিভার্স ব্রেন ড্রেইন, প্রবাসী কর্মী দক্ষতা প্রশিক্ষণ, RemitMiles সুবিধা।
ইশতেহারটি মোট ৩৬ দফা মূল প্রতিশ্রুতি নিয়ে গঠিত। দলটি স্পষ্ট করেছে, জোটে অংশগ্রহণ করলেও তাদের মূল লক্ষ্য হলো সংস্কার ও দেশের পুনর্গঠন, যেখানে নাগরিক নিরাপত্তা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অঙ্গীকারের কেন্দ্রবিন্দু।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমরা জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী জোটে আছি। এতে প্রশ্ন উঠেছে, নতুন বন্দোবস্তের লক্ষ্যে আমরা কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের দীর্ঘ লড়াই এখনও চলমান, এবং জোট হওয়া সত্ত্বেও আমরা আমাদের অগ্রাধিকার ও সংস্কারের দাবিতে অটল থাকব। নির্বাচনী জোট হলেও এতে কিছু ন্যূনতম রাজনৈতিক ঐকমত্য রয়েছে। আমরা এই জোটের মধ্য দিয়ে দেশের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের চেষ্টা চালাব।
এনসিপির ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানের শুরু হয় বেলা সাড়ে তিনটায় জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে। এরপর নির্বাচনী প্রচারের ‘থিম সং’ পরিবেশন করা হয়। বক্তব্য রাখেন দলের মুখপাত্র ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া, এবং ইশতেহারের মূল বিষয়গুলো উপস্থাপন করেন যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক ও কূটনীতিকসহ বিভিন্ন অতিথি। ইশতেহারের বিষয়ভিত্তিক আলোচনা পরিচালনা করেন যুগ্ম আহ্বায়ক, সেক্রেটারি ও কমিটির অন্যান্য সদস্যরা। অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিতরা ইশতেহারের উদ্দেশ্য ও অঙ্গীকারকে সমর্থন জানিয়ে প্রশংসা করেন।

























